মিশেল ফুকোর দর্শন ও ফুকোর মানব
লেখক: মঈন চৌধুরী
[আমি মানুষ, তুমি মানুষ, সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মুখলোকাত। তোমার আর আমার মাঝে এমন সব গুণ সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন যার ফলে আমরা হয়েছি ফেরেশতা কিংবা জ্বীন থেকে অনেক অনেক মহৎ। আমাদের মাঝেই ঈশ্বর স্থাপন করেছেন দেবতার গুণাবলী; আমরা হয়েছি ঈশ্বরের অবতার। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত এই গুণাবলীকে কেন্দ্র করেই মাঝে মধ্যে আমরা জন্ম নিচ্ছি পীর, ফকির, সাধু, সন্ন্যাসী কিংবা সমাজ সংস্কারক হিসেবে। মানবত্বের বাণী প্রচার করে আমরা তোমাদের জীবন আর সমাজকে সুন্দর করব, আমরা জাগিয়ে তুলব তোমাদের বিবেককে। তোমরা যদি আধুনিক যুক্তিবাদী হও, যদি অবিশ্বাস কর সাধু, সন্ন্যাসী, পীর, ফকির কিংবা ধর্মকেন্দ্রিক সমাজ সংস্কারকের ভূমিকা, তবু আমরা মানবত্ব প্রচারের তাগিদেই বারবার তোমাদের মাঝে ঘুরেফিরে আসবো। আমাদের নতুন নাম হবে বুদ্ধিজীবী, কলামিষ্ট (কলমবাজ), রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, পুলিশ, চিকিৎসক, এনজিও কর্মকর্তা, সম্পাদক, আমলা, সাংবাদিক, উকিল, ব্যারিস্টার কিংবা তোমাদের পছন্দমতো অন্য কোনো কিছু। আমাদের তোমরা যে নামেই ডাক না কেন, আমরা হলাম রসুনের মতো, গোড়ায় এক। আমরা কোনো এক কেন্দ্রবিন্দু দ্বারা পরিচালিত কিংবা ব্যবহৃত হই এবং ব্যবহার করি তোমাদের। আমাদের কেন্দ্রের ইংরেজী নাম Power Centre এবং এই কেন্দ্রটিই আমাদের ধারণ করে পরিচিত হয় Power Structure কিংবা ক্ষমতা-কাঠামো নামে। ক্ষমতা হলো সৃষ্টিকর্তা কিংবা প্রকৃতির দান এবং এ কারণেই 'ক্ষমতা' প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজন হয় 'মানবত্ব' প্রয়োগের। আমরা মানব-প্রমিক, আমরা হলাম সমাজসেবক। আমরা তোমাদের আশেপাশেই থাকি এবং এ কারণেই মিশেল ফুকো নামক এক ভদ্রলোক সহজেই আমাদের আবিষ্কার করতে পেরেছেন। ফুকোর তত্ত্ব অনুসারে আমাদের সবার সম্মিলিত নাম দেওয়া যায় 'ফুকোর মানব'। তোমরা ইচ্ছে করলে মিশেল ফুকো পড়ে দেখতে পার, কিন্তু ভুলেও তার কথা বিশ্বাস করো না। আমরা মানব-প্রেমিক, মানবত্ব আমাদের ধর্ম। জয় মানবত্ব, মানবত্ব জিন্দাবাদ।]
'ফুকোর মানব'-এই শব্দ-যুগল গ্রন্থনা করা হয়েছে বিশ শতকের দার্শনিক মিশেল ফুকোর তত্ত্ব-ধারণাকে কেন্দ্র করে। ফ্রান্সের পয়তিয়ে শহরে ১৯২৬ সালে মিশেল ফুকোর জন্ম হয়েছিল। প্যারী নগরীর 'লিসে অঁরী কাত্র' এবং 'একল নার্মালে' অধ্যয়ন করেন তিনি। দর্শন ও মনস্তত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করার পর ফ্রান্স, সুইডেন ও পোল্যান্ডে বেশ কিছুদিন অধ্যাপনা করেন মিশেল ফুকো। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত গবেষণাপত্র 'ক্লাসিকাল যুগে উন্মাদনার ইতিহাস', যার সারাংশ ১৯৬৫ সালে Madness and Civilization: A History of Insanity in the Age of Reason শিরোনামে ইংরেজী ভাষায় অনূদিত হয়। 'ক্লাসিকাল যুগে উনন্মাদনার ইতিহাস' প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই মিশেল ফুকো দার্শনিক হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন, কারণ ‘উন্মাদনার ইতিহাস’ ব্যক্ত করতে গিয়ে মানব-চরিত্রের এক নতুন মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন তিনি। মানুষের কিংবা মানব সমাজের চরিত্র বিশ্লেষণ করার জন্য মিশেল ফুকো ইতিহাসের আশ্রয় নেন এবং পাগল বা উন্মাদদের সাথে বিভিন্ন যুগের মানব সমাজ কী ধরনের আচরণ করেছে তা উপস্থাপন করেন যুক্তির সাথে। ইউরোপীয় মধ্যযুগ থেকে আরম্ভ করে রেনেশাঁস পর্যন্ত উন্মাদ ও স্বাভাবিক মানুষ একই সাথে একই সমাজে সহ-অবস্থান করতে পারত, কারণ যুক্তি ও অযুক্তির দ্বন্দ্ব খুব একটা প্রকট ছিল না। এ সময়ে সমাজের বাইরে অবস্থান করত শুধুমাত্র কুষ্ঠ রোগীরা, যাদের জন্য তৈরী করা হয়েছিল বিভিন্ন কুষ্ঠাশ্রম। মধ্যযুগ ও রেনেশাঁস আমলে পাগল কিংবা উন্মাদদের ঐশ্বরিক গুপ্ত-জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে গণ্য করা হতো এবং প্রায় সময়ই উন্মাদরা স্বাভাবিক মানুষের কাছ থেকে শ্রদ্ধা-ভক্তি পেতো ঈশ্বরের পাগল প্রতিনিধি হিসেবে।
[এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে আমাদের দেশে এখনও গ্রামে-গঞ্জে পাগলা-বাবাদের গুপ্ত-জ্ঞানী বা মারেফত বিশেষজ্ঞ ভাবা হয় এবং এই সব পাগলা, এমনকি ন্যাংটা-বাবাদের ভক্ত থাকে অনেক। পাগলা আর ন্যাংটা বাবাদের মৃত্যুর পরই তৈরি করা হয় কবর-পূজার আস্তানা কিংবা মাজার এবং এক
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments